রোবটিক্স কি?
রোবটিক্স শব্দটি এসেছে রোবট থেকে। এই প্রযুক্তিগত শাখাটি রোবটের নকশা, নির্মাণ এবং এর ব্যবহার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করে। হয়ত, এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসছে, রোবট কী?
রোবট কি?
রোবট এমন একটি মানব-নির্মিত স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম, যা মানুষের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে এবং এর কার্যক্রম দেখে মনে হয় যে এটি কিছুটা বুদ্ধিমান। রোবট শব্দটি এসেছে চেক শব্দ ‘রোবটা’ থেকে, যার অর্থ হলো বাধ্য শ্রম বা মানুষের দাস হিসেবে কাজ করা কিছু।
সহজভাবে বলতে গেলে, রোবট হলো একটি যন্ত্র যা মানুষের কাজে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন কাজের জন্য মানব বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
রোবটিক্স হলো সেই বিজ্ঞান শাখা, যেখানে রোবট তৈরি, ডিজাইন এবং এর ব্যবহারের উপায় নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করা হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের চাহিদাও বাড়ছে। এর ফলে রোবটিক্সের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব যথেষ্ট বেড়ে গেছে।
রোবটিক্সের সূত্রপাত

রোবটের ধারণাটি প্রাচীন সংস্কৃতির বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন প্রকার কৃত্রিম পাখি, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও এর মতো অন্যান্য প্রযুক্তির পরিচয় আমরা এসব পৌরাণিক কাহিনী থেকে পেয়েছি। এই কারণে বলা যায়, রোবটিক্সের উন্মেষ অনেক অনেক বছর আগে থেকেই হয়েছে।
রোবটিক্সের জনক
আরও বলতে গেলে, প্রথম ডিজিটাল এবং প্রোগ্রামযোগ্য রোবটের আবিষ্কারক হলেন বিজ্ঞানী জর্জ ডিভোল। তাই আধুনিক রোবটিক্সে তাকে মূল প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রোবটিক্স শব্দটি প্রথম কোথায় ব্যবহৃত হয়?
রোবটিক্স শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল একটি সায়েন্স ফিকশন গল্পে, যার নাম ‘লায়ার’। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত আইজ্যাক আসিমভের এই গল্পে প্রথমবারের মতো রোবটিক্স শব্দটি দেখা যায়।
রোবট এবং রোবটিক্সের মধ্যে পার্থক্য
রোবট একটি মানবসৃষ্ট স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যা মানুষের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে। অন্যদিকে, রোবটিক্স হলো গবেষণা এবং বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির একটি শাখা, যা রোবটের ডিজাইন, নির্মাণ এবং প্রয়োগের বিষয়ে আলোচনা করে। এক কথায়, রোবট হলো যন্ত্র এবং রোবটিক্স হলো সেখানকার বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়ন। আশা করি এ বিষয়ে আপনারা পরিষ্কার একটি ধারণা পেয়েছেন।
রোবটিক্সের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৯২০ সালে প্রথমবারের মতো চেক নাট্যকার কেরেনাল কাপেক ‘রোবট’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তবে রোবটিক্সের মূল সৃষ্টি প্রাচীন যুগে ঘটেছিল। আধুনিক রোবটের বিকাশ শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের পর থেকে, যখন প্রথম জটিল আচরনের ইলেকট্রনিক স্বায়ত্তশাসিত রোবট তৈরি হয় ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে উইলিয়াম গ্রে ওয়াল্টারের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল নিউরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটে।
Also Read
১৯৫৪ সালে প্রথম ডিজিটাল এবং প্রোগ্রামযোগ্য রোবট উদ্ভাবন করেন জর্জ ডিভোল। এরপর ২০০০ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের মাধ্যমে আধুনিক শিল্প রোবট তৈরি হয়। ২০০৪ সালে কার্নেল ইউনিভার্সিটি প্রথম এমন রোবট প্রকাশ করে, যা স্ব-প্রতিক্রিয়ায় সক্ষম ছিল।
এটি ছিল বিশ্বের প্রথম রোবট, যা নিজ থেকেই প্রথম কপি তৈরির সক্ষমতা রাখত। সর্বশেষে উল্লেখযোগ্য রোবট হলো সোফিয়া, যা সৌদি আরব কর্তৃক তৈরি করা হয় এবং ২৫ অক্টোবর ২০১৭ সালে চালু করা হয়। এটি বিশ্বের প্রথম রোবট, যিনি কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেছে।
রোবটিক্সের নীতিমালা
১৯৪১ ও ১৯৪২ সালে আইজ্যাক অ্যাজিমভ রোবটিক্সের জন্য তিনটি মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করেন। এই নীতিগুলি হলো:
প্রথমত, একটি রোবট কখনো কোনো মানুষের ক্ষতি করতে পারে না এবং আদেশের মাধ্যমে বা নিস্ক্রিয়ভাবে মানুষের ক্ষতি হতে দেয় না।
দ্বিতীয়ত, একটি রোবটকে অবশ্যই মানুষের দেয়া নির্দেশাবলী পালন করতে হবে, কিন্তু এই নির্দেশাবলী প্রথম নীতির বিরুদ্ধে হতে পারে না।
তৃতীয়ত, কোনো রোবটকে তার নিজ অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে, তবে সেই সুরক্ষা প্রথম বা দ্বিতীয় নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া উচিত নয়।
এছাড়া, ১৯৪৮ সালে নরবার্ট উইনার সাইবারনেটিক্সের মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করেন, যা কার্যকরী রোবটিক্সের বুনিয়াদ হিসেবে গণ্য।
বিশ্বের প্রথম রোবট কেমন ছিল?
বিজ্ঞানীরা বিংশ শতাব্দীর সূচনায় কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে রোবট তৈরির পরিকল্পনা শুরু করেন। বিশ্বের প্রথম প্রোগ্রামেবল রোবটটির নাম ছিল ইউমিনেট, যা ১৯৫৪ সালে জর্জ ডেভেল আবিষ্কার করেন। তিনি এই রোবটের নাম দেন Unimate।
পরে, ১৯৬১ সালে তিনি এটি জেনারেল মোটরস কোম্পানির কাছে বিক্রি করেন। ইউমিনেটের প্রধান কাজ ছিল ভারী ধাতু লোড ও আনলোড করা এবং দুটি স্থানান্তরের মধ্যে ভারী বস্তু স্থানান্তর। ইউনিমেটের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আধুনিক স্বয়ংক্রিয় রোবটের যাত্রা।
এর পর, ১৯৬৬ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রথম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত একটি রোবট তৈরি করে, যার নাম ছিল ‘শেকি’। এই রোবটটি টেবিলের বাধা অতিক্রম করার কৌশলটি শিখেছিল এবং একটি ঘরের দেয়ালগুলো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চলাফেরা করতে সক্ষম ছিল।
রোবটের বিভিন্ন প্রকারভেদ
রোবটের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেছে বলেই আশা করি। এখন রোবটের বিভিন্ন প্রকারে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। রোবটগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে ভাগ করা একটু কঠিন, কারণ সব ধরনের রোবটের মৌলিক ধারণা অভিন্ন। তবে, রোবটগুলো কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং ব্যবহারের লক্ষ্যে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে।
নিচে কিছু রোবট প্রকারভেদ তুলে ধরা হলো:
শিল্প রোবট: এই ধরনের রোবটগুলো সাধারণত উৎপাদনশীলতা এবং কাজের সঠিকতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত হয়। শিল্প রোবটের মধ্যে প্রধান কাজগুলো হলো: পেইন্টিং, হ্যান্ডলিং ও ওয়েল্ডিং।
মহাকাশ রোবট: এই রোবটগুলোর একটি বিশাল ব্যবহার রয়েছে যা সাধারণত মহাকাশে কাজের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। NASA বিভিন্ন কাজের জন্য মঙ্গলগ্রহে এমন অনেক রোবট পাঠিয়েছে।
ঘরোয়া রোবট: গৃহকর্মের জন্য এই রোবটগুলো ব্যবহৃত হয়, উদাহরণস্বরূপ, রোবটিক স্পিনার, পুল ক্লিনার, রোবটিক ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ইত্যাদি।
গ্রাহক রোবট: এই রোবটগুলো আপনার ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন রোবট ডগ আইবো, এআই চালিত রোবট সহকারী, এবং রোম্বা ভ্যাকুয়াম রোবট।
দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া রোবট: যে রোবটগুলো জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে সাধারণত এই শ্রেণিতে রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে জাপানের ভূমিকম্প ও সুনামের পরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত পুকবট রোবটটি উল্লেখযোগ্য।
হিউম্যানোয়েড রোবট: রোবটের মধ্যে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক বিভাগ হলো হিউম্যানোয়েড রোবট। এই রোবটগুলো মানুষের মতন আচরণ করতে সক্ষম, এবং অনেক সময় মানুষেরই মতো কাজ করে। তারা দৌড়াতে, লাফাতে এবং জিনিসপত্র বহন করতে সক্ষম। এই ধরনের রোবটের চমৎকার উদাহরণ হলো রোবোট সোফিয়া এবং রোবোট আটলাস।
মেডিকেল রোবট: মেডিকেল রোবটগুলো সাধারণত বিভিন্ন চিকিৎসা এবং ঔষধ প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রোবটগুলির মধ্যে একটি হচ্ছে অস্ত্রোপচার রোবট। ঔষধ তৈরির কাজেও অনেক রোবট ব্যবহার করা হয়।
সামরিক রোবট: সামরিক রোবটের নাম শুনলেই বোঝা যায়, এগুলো বোঝায় কোন কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। সামরিক কার্যক্রমে আজকাল অনেক রোবটের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই ধরনের রোবটকে সামরিক রোবট বলে। বিভিন্ন বোমা নিষ্পত্তি ও তল্লাশি কাজকর্মে সামরিক রোবটের কার্যকরী ব্যবহার করা হয়।
বিনোদন রোবট: বিনোদন ক্ষেত্রে আজকাল রোবটের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই রোবটগুলো প্রায়শই শিশুদের খেলনা হিসেবে তৈরি হয়। এগুলো নাচতে, গান গাইতে ও দৌড়াতে পারে এবং শিশুদের সঙ্গে খেলা করতে সক্ষম। দিনে দিনে শিশুদের মধ্যে এই রোবটগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
এ ছাড়া এই রোবটগুলি আরও অনেক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রোবট কাজ করে কিভাবে?
রোবট যেহেতু মানুষ নয়, তাই এটি নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি মাইক্রো কন্ট্রোলার বা মাইক্রো প্রসেসর ব্যবহার করা হয়। বাইরের পরিবেশের বিভিন্ন পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য কয়েকটি সেন্সর রয়েছে।
প্রথমে, রোবটের প্রসেসরে কিছু কমান্ড লেখা প্রয়োজন, যাতে এটি আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ সম্পাদন করতে পারে। রোবটের বিভিন্ন অংশের মধ্যে গতিশীলতার জন্য মোটর ব্যবহার করা হয়। যোগাযোগে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি যেমন আর এজ, ব্লুটুথ, ওয়াইফাই, ইথারনেট, ও জিপিএস ব্যবহৃত হয়।
রোবট প্রোগ্রামিংয়ের জন্য বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করা যায়, যেমন সি, সি++, জাভা, পাইথন ইত্যাদি। আশা করছি, রোবট কিভাবে কাজ করে তা সম্পর্কে আপনার একটি মৌলিক ধারণা তৈরি হয়েছে।
রোবটিক্স ও ভবিষ্যতের বিশ্ব

বর্তমানে রোবট একটি আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগে রোবট সোফিয়ার কারণে সারা বিশ্বের মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে আপনি কি জানেন, এই রোবট আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবী কেমন করে তৈরি করতে পারে?
সম্ভবত এমন একটা সময় আসবে যখন আপনাকে কোন কাজ করতে হবে না। সবকিছুই রোবট করে দিবে। এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রোবটের ব্যবহার হতে পারে, শুনে অবাক হচ্ছেন?
বেশিরভাগ বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে তৈরি হওয়া কিছু হিউম্যানোইড রোবট আপনার যৌন চাহিদা পূরণে সক্ষম। যদিও এই রোবটের ব্যবহার নিয়ে এখনও বিতর্ক চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের রোবটের উদ্ভাবন নারীদের ও শিশুদের উপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়াও, একসময় এমন পরিস্থিতি হতে পারে যে আপনি কাজহীন হয়ে পড়বেন, ফলে জীবন কেনো মানে তা ভুলে যেতে পারেন। এই আশঙ্কার ভিত্তিতে বেশ কিছু হলিউড সিনেমাও নির্মিত হয়েছে এরই মধ্যে।
শেষ কথা
তবে নিঃসন্দেহে বলতে গেলে, রোবট অবশ্যই মানুষের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে। কারণ আমরা তো এগুলো তৈরি করেছি। তাই এই ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আশা করি, নিবন্ধটি আপনার জন্য সহায়ক হবে। সুস্থ থাকুন।


