যেকোনো একটি কাজ সঠিকভাবে করতে হলে আমাদের প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা। সেই কাজটির সফলতা নির্ভর করে উক্ত পরিকল্পনাটি কতটুকু শক্তিশালী তার উপর। ঠিক সেভাবেই হ্যাকিং (Hacking) করতে সবার প্রথম প্রয়োজন হয় একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনার। পরিকল্পনা যত স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী হবে টার্গেট তত দ্রুত ফাঁদে পড়বে।
তবে এসব কাজে সর্বোচ্চ ফলাফল পাবার জন্য হ্যাকাররা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে। কারণ এসব পদ্ধতিগুলো টার্গেট সম্পর্কে সব প্রয়োজনীয় ডাটা (Data) এবং টার্গেটের দূর্বল পয়েন্টগুলো খুঁজে পেতে সহায়তা করে। আজকের এই নিবন্ধে হ্যাকিং পদ্ধতিগুলো (Method) কি কি সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।
কিভাবে হ্যাক করা হয়?
আরও সহজভাবে বলতে গেলে একজন চোর যেভাবে চুরি করে ঠিক সেভাবে হ্যাকাররা হ্যাক করে। চোর যদি কোন বাড়িতে চুরি করতে যায় তখন সেই বাড়ির ঠিকানা চোরের আগে জানতে হয়। যখন আমরা অনলাইনে যুক্ত হই তখন অনলাইনে আমাদের একটা ঠিকানা তৈরি হয়, একে বলা হয় আইপি এড্রেস (IP Address)। এটি হল আমাদের ঠিকানা মানে পরিচয়।
চোর বাড়ি এতক্ষণে চিনে ফেলেছে, এখন আর দরকার একটি পরিকল্পনার। কিভাবে সে বাড়িতে ঢুকে সব জিনিস চুরি করে ফিরবে। এর জন্য বাড়ির কিছু দূর্বল জায়গা বা ত্রুটি তার খুঁজে বের করতে হবে এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে হবে। হ্যাকারদের ক্ষেত্রে এই যন্ত্রপাতিই হল বিভিন্ন সফটওয়্যার বা স্ক্রিপ্ট।

হ্যাকিং একটি creative কাজ। হ্যাকাররা যতটা চালাক এবং দক্ষ হবে হবে সে তত ভাল এবং শক্তিশালী হ্যাকার হবে। অধিকাংশ হ্যাকারদের তাদের নিজস্ব তৈরি স্ক্রিপ্ট বা বিভিন্ন টুলস (Tools) থাকে।
তবে এখন পর্যন্ত যত টেকনিক ব্যবহার করে হ্যাকিং করা হয় সেগুলোকে কয়েকটি পদ্ধতিতে ভাগ করা হয়েছে। এবার আমরা সেই মেথডগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।
সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (Social Engineering)
এ পদ্ধতিতে সাধারণত টার্গেটের Psychological manipulation ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় Data সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ অন্যান্য হ্যাকিংয়ের পদ্ধতিতে বিভিন্ন tools ব্যবহার করতে হয়, কিন্তু social engineering method এ কোন টুল ব্যবহারের কোন প্রয়োজন হয় না।
যদিও ডাটা সংগ্রহয়ের জন্য কিছু টুলসের সহায়তা নেয়া হয়ে থাকে, তবে এসব শুধুমাত্র ডাটা কালেক্ট পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এ মেথডে হ্যাকিং করা হয় সরাসরি টার্গেটের সাথে যোগাযোগ করে। এককথায় বলতে গেলে হ্যাকার প্রথমেই টার্গেটের কাছে বিশ্বাস তৈরি করে। যেমন- অনলাইনে ভার্চ্যুয়াল প্রেমের সম্পর্ক অথবা কাছের বন্ধুর সম্পর্ক।
আবার অনেকেই অন্যের identity চুরি করে এই হ্যাকিং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে। তবে হ্যাকাররা যে রাস্তায় অবলম্বন করুক না কেনো হ্যাকারের উদ্দেশ্যেই হল টার্গেটের একাউন্ট বা সিস্টেমে প্রবেশের তথ্য কালেক্ট করে।
Also Read
সারাবিশ্বে প্রতিনিয়ত অনেক মানুষ social engineering এর স্বীকার হয় এবং হ্যাকারকে তার personal account এর তথ্য দিয়ে দেয়। এই পদ্ধতি যদিও একটু দীর্ঘমেয়াদি তবে এটি একটি অন্যতম হ্যাকিং পদ্ধতি হ্যাক করার জন্য।
হ্যাকিং পদ্ধতি কিলগার (Keylogger)
এটি এমন একটি পদ্ধতি যা ব্যবহার করে কী-বোর্ডের স্ট্রোকগুলো রেকর্ড করা হয়। username এবং password হ্যাক করার জন্য কিলগার একটি সহজ পদ্ধতি। সাধারণত কিলগার প্রোগ্রাম সরাসরি computer এ install দিয়ে অথবা strorage device (পেনড্রাইভ) এ pre -install করে কম্পিউটারে insert করতে হয়।
কিলগার মেথডের কাজ হল এতে এমন কমান্ড দেয়া যা কি-বোর্ডের স্ট্রোকগুলো রেকর্ড করে রাখে। পরবর্তীতে রেকর্ড করা সকল স্ট্রোক ডেটাগুলো কিলগারের মেইল অ্যাড্রেসে বা কিলগার টুলসের ড্যাশবোর্ডে পাঠিয়ে দেয়।
হ্যাকার সেই ডাটা থেকে টার্গেটের ইউজারনেইম এবং পাসওয়ার্ড খুঁজে বের করে। যেমন -মনে করুন আপনার টার্গেটের twitter লগইন করার স্ট্রোক ডেটাগুলো আপনার কাছে আছে। এখন স্ট্রোক ডাটা থেকে লগইন ইউজারনেইম এবং পাসওয়ার্ড খুঁজে বের করতে আপনার একটু কষ্ট করতে হবে।
কারণ কিলগার থেকে ডেটাগুলো অগোছালো ভাবে আপনার কাছে আসবে। তবে সামান্য একটু বুদ্ধি খাটালেই লগইন ইনফরমেশন খুঁজে পাবেন আপনি।
যেহেতু টার্গেট টুইটার লগইন করবে সেহেতু উক্ত অগোছালো ডাটাতে আপনাকে www.twitter.comusernamepassword এ ধরণের লেখা খুঁজে বের করতে হবে। এখানে usernamepassword এই লেখার জায়গায় লগইন ইনফরমেশন পাবেন।
হ্যাকিং পদ্ধতি ফিশিং (Phishing)
হ্যাকিং যখন শুরু হল তখন থেকেই ফিশিং মেথড ব্যবহার করে হ্যাক করা হয়। এর কারণ ফেক ওয়েবপেইজের সাহায্যে মানুষকে বোকা বানানো খুবই সহজ। মানুষ সবসময় অনলাইনে সবকিছু তেমন গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে না। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা ফিশিং মেথড ব্যবহার করে হ্যাকিং কার্যক্রম সম্পূর্ণ করে।
মূলত ফিশিং মেথডে কোন পপুলার ওয়েবসাইটের হুবুহু কপি ওয়েবসাইট বা ওয়েবপেজ বানিয়ে হ্যাকিং কার্যক্রম সম্পূর্ণ করা হয়। যেমন ধরুন আপনি ফেইসবুক স্ক্রল করছেন এমন সময় আপনার ফেসবুকে একটি লিংকসহ মেসেজ আসলো।
আপনি খুব কৌতূহলি হয়ে মেসেজের দেওয়া ঔ লিংকে ক্লিক করলেন। ক্লিক করার সাথে সাথে আপনার ফেইসবুক লগআউট হয়ে গেল। পুনরায় লগইন করতে ঐ পেজটিতে username এবং password দিয়ে login বাটনে ক্লিক করলেন। কিন্তু error দেখাচ্ছে। বারবার error দেখানোর কারণে আর লগইন করতে পারছেন না।
কিন্তু login বাটনে ক্লিক করার সাথে সাথে আপনার ফেইসবুক হ্যাক হয়ে গেল আপনি এটা বুঝতেও পারলেন না। এখানে আপনার অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে হ্যাকার আপনার অজান্তেই ফেইসবুক হ্যাক করে নিয়েছে।
ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার (Virus or Malware)
আমরা সবাই কম্পিউটার ভাইরাস সম্পর্কে টুকটাক শুনেছি। মূলত ভাইরাস (virus) কম্পিউটারের ক্ষতি করতে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে অ্যাডওয়্যার, ট্রোজান, রান্সমওয়্যার ইত্যাদি কম্পিউটার হ্যাক করতে ব্যবহৃত হয়। virus or malware হল মিলিসিয়াস কোডের সমষ্টি। এসব ব্যবহার করে সিস্টেম এবং কম্পিউটার হ্যাক করা হয়। আমরা বর্তমানের ত্রাস রানসমওয়্যার সম্পর্কে কিছুটা জানি। এটি একটি কম্পিউটারের সব ফাইল এনক্রিপ্ট করে থাকে। এরপর মালিকের কাছে মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করে।
সারা বিশ্বের বহু কম্পিউটার এই ধরনের অ্যাটাকের সমস্যায় পরে তাদের সকল ডাটা হারিয়েছে। এছাড়া হ্যাকাররা অন্যান্য ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে ডাটা সংগ্রহ করার কাজ করে। কিছু ম্যালওয়্যার আছে যা ব্যবহারকারীর অজান্তেই হ্যাকারের জন্য ব্যাকডোর খোলা রাখে এবং গুরুত্বপূর্ণ ডাটা হ্যাকারের নিকট বাইপাস করে।
ডিডস অ্যাটাক (DDos Attack)
ডিস্ট্রিবিউটেড ডেনিয়াল অফ সার্ভিস অ্যাটাক (Distributed Denial of Service Attack) বা DDos Attack ব্যবহার করা হয় ওয়েবসাইটকে ডাউন করার জন্য। প্রতিটি ওয়েবসাইট অনলাইনে লাইভ সার্ভারে হোস্ট করা থাকে। যখন আমারা কোন ওয়েবসাইট ভিজিট করতে চাই, তখন ব্রাউজার সেই রিকোয়েস্ট হোস্টিং সার্ভারে পাঠায়। হোস্টিং সার্ভার সেই রিকোয়েস্ট অনুসারে লাইভ পেজ প্রসেস করে তা ব্রাউজারে পুনরায় ফেরত পাঠায়।
যদি কোন কারণে ঐ রিকোয়েস্টটি হোস্টিংয়ের কাছে না যায় তাহলে আমরা ঐ ওয়েবসাইট আর ভিজিট করতে পারব না। তাছাড়া, প্রতিটি হোস্টিং সার্ভারের রিকোয়েস্ট নিয়ন্ত্রণ করার নির্দিষ্ট লিমিট থাকে। এই লিমিটেশনের বাইরে হোস্টিং আর কোন রিকোয়েস্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং পরবর্তীতে ক্র্যাশ করে।
সাধারণত DDos অ্যাটাকের প্রধান উদ্দেশ্যেই থাকে এক সঙ্গে অগণিত অপ্রয়োজনীয় রিকোয়েস্ট হোস্টিং সার্ভারে পাঠানো। এতে হোস্টিং সার্ভার অতিরিক্ত রিকোয়েস্ট এর চাপে ক্র্যাশ করে পরবর্তীতে ওয়েবসাইট অফলাইন হয়ে যায়।
হ্যাকিং পদ্ধতি কুকি থেফট (Cookie Theft)
একটি ব্রাউজারে কুকি (cookie) তে প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ ডাটা লুকানো থাকে। যেমন একাউন্ট লগইন ডাটা, ওয়েবসাইট ব্রাউজ ডাটা ইত্যাদি। এগুলো কোন হ্যাকারের হাতে পরলে হ্যাকার এসব ডাটা ব্যবহার করে যা পাবে তা দিয়ে আপনার সব একাউন্ট এবং সিস্টেমে ঢুকতে পারবে। আর আপনার জীবন একেবারে শেষ করে দিবে।
হ্যাকিং পদ্ধতি ক্লিকজ্যাকিং (Clickjacking)
ক্লিকজ্যাকিং হ্যাকারদের আবিষ্কৃত এবং এটি খুবই কার্যকরী একটি পদ্ধতি। বর্তমানে কিছু ওয়েবসাইট নোটিফিকেশন বাটুন ব্যবহার করে। সেখানে ক্লিক না করা পর্যন্ত নোটিফিকেশনটি ওয়েবসাইটেই থেকে যায়। হ্যাকাররা এই জাতীয় ক্লিক করা এলিমেন্ট ব্যবহার করে হ্যাকিং কার্যক্রম করে। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে ব্যবহারকারীকে বাটুনে ক্লিক করার জন্য বিভিন্ন প্রলোভন দেখানো হয়। আর সেই নোটিফিকেশন বাটুনে ক্লিক করলেই সাথে সাথে আপনার সিস্টেম হ্যাক হয়ে যাবে।
হ্যাকিং পদ্ধতি এক্সএসএস (Cross-Site Scripting)
এক্সএসএস মেথড সরাসরি কোন ওয়েবসাইট এবং ওয়েব এপস হ্যাক করতে ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেটে একে ক্রস সাইট স্ক্রিপ্টিং নামেও ব্যবহার করা হয়। কোন ওয়েবসাইট বা ওয়েব এপস এ ক্ষতিকারক কোড বা স্ক্রিপ্ট যোগ বা রান করার জন্য এক্সএসএস পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে ওয়েবসাইটে নতুন পেজ যোগ করা থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ সার্ভারের এক্সেস পর্যন্ত নেওয়া যায়।
এসকিউএল ইনজেকশন (SQL Injection)
এসকিউএল পদ্ধতি মূলত ডাটাবেইজ থেকে ডাটা চুরি করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে অনেক ওয়েবসাইট এই পদ্ধতিতে হ্যাক করা হয়। হ্যাকার এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ডাটাবেইজে প্রবেশ করে সম্পূর্ণ ডাটা ডাওনলোড করতে পারে।
এতে ওয়েবসাইটে থাকা সব ইউজারের ডাটা হ্যাকারের নিকট চলে যাবে। এমনকি হ্যাকার ওয়েবসাইটের এডমিন একাউন্ট পর্যন্ত বাইপাস করতে পারে। এতে আপনি আপনার সম্পূর্ণ ওয়েবসাইট হারাতে পারেন।
শেষ কথা -ঃ
হ্যাক করার অনেক অনেক পুরাতন এবং নতুন পদ্ধতি আছে। এসবের মধ্যে অনেকগুলো পদ্ধতি কাজ করে আবার কিছু পদ্ধতি কাজ করে না। তবে হ্যাক করতে হলে কম-বেশি প্রায় সব পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। কারণ কখন কোন মেথড ব্যবহার করতে হবে তা পূর্বে নির্ধারণ করা সম্ভব না।
উপরোক্ত নিবন্ধটি সঙ্গে জড়িত কোন প্রশ্ন কিংবা মতামত থাকলে অবশ্যই নিচে কমেন্ট বক্সে জানাবেন। আর এ নিবন্ধটি আপনার কাছে ভাল লাগলে অবশ্যই আপনার বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করবেন।


