ব্লকচেইন প্রযুক্তি নামটি হয়তোবা ইতিমধ্যে অনেকেই শুনে থাকবেন। আবার অনেকেই হয়তো এখনো শুনেন নাই। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনারা সবাই বিটকয়েন নামটি প্রত্যেকেই শুনেছেন ইতিমধ্যে।
বিটকয়েন হল ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা যার কোন physical অস্তিত্ব নেই। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এই বিটকয়েন বাজারে আসার পর থেকে ব্লকচেইন নিয়ে মানুষের আগ্রহ দিনদিন বেড়ে গিয়েছে। এর কারণ বিটকয়েন অথবা অন্য যেসব ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে তা এই ব্লকচেইন টেকনোলজির উপর নির্ভর করে কাজ করে থাকে।

blockchain technology বর্তমান সময়ে ব্যাপক হাইপ তৈরি করেছে। এর কারণ এই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ব্লকচেইন টেকনোলজি আমূল পরিবর্তন করে দিতে চলছে। কথা হল আপনি যদি এখনও ব্লকচেইন টেকনোলজি সম্পর্কে কিছু না জেনে থাকেন তাহলে আজকের এই পুরো নিবন্ধনটি আপনার জন্য।
সুতরাং সম্পূর্ণ পড়ার চেষ্টা করুন তাহলে অনায়াসেই আপনি জানতে ও বুঝতে পারবেন ব্লকচেইন টেকনোলজি বা ব্লকচেইন প্রযুক্তি কি, কিভাবে কাজ করে, কত প্রকার এবং এর সুবিধা ও অসুবিধা সম্পর্কে?
ব্লকচেইন কি (What is Blockchain) ?
ডাটা স্টোর করতে সবচেয়ে নিরাপদ একটি স্থান হল এই ব্লকচেইন। যা কেউ সহজে নষ্ট বা হ্যাক (Hack) করতে পারবে না। মূলত বিটকয়েন বা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সি, ইনভেস্টিং এবং ব্যাংকিং এর বিভিন্ন ধরনের ডাটা ব্লকচেইনে স্টোর বা জমা করে রাখা হয়।
ব্লকচেইন হল কতগুলো ব্লকের একত্র সমষ্টি (chain of block)। যেই ব্লক গুলো মূলত একটি অন্য আর একটির সঙ্গে চেইনের আকারে বাঁধা থাকে। এই একটি আলাদা আলাদা ব্লকগুলোতে ডাটা জমা থাকে।
নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি ব্লকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি ইউনিক নাম্বার থাকে যা block hash নামে সবার কাছে পরিচিত। আর প্রতিটি ব্লকে তার আগের ব্লকের hash information থাকে।
সহজ কথায় ব্লকচেইন কি?
এটি হল ব্লকচেইন = ব্লক+চেইন। এর একটি ব্লক অন্য ব্লকের সাথে চেইন আকারে যুক্ত থাকে। পেয়ার টু পেয়ার (pair to pair) এবং decentralize Network এর মাধ্যমে কতগুলো ব্লকে ডাটা এবং তথ্য সিকিউর (Information Secure) ভাবে রাখা হয়। আর যে ব্লকগুলো একটি অপরটির সঙ্গে চেইন আকারে কানেক্ট বা সংযুক্ত থাকে তাকেই ব্লকচেইন বলা হয়।
ব্লকচেইন প্রযুক্তি এর ইতিহাসঃ-
মূলত ব্লকচেইন অনেক পুরনো একটি প্রযুক্তি। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ১৯৯১ সালে Stuart Haber এবং W. Scott Stornetta এই দুইজন ব্যক্তির দ্বারা ব্লকচেইন প্রযুক্তির আবির্ভার ঘটে। তখন ঐ সময়ে কিন্তু এই ব্লকচেন প্রযুক্তির জনপ্রিয়তার কোন গুরুত্বই ছিল না।
Also Read
এরপর ২০০৮ সালে সাতোশি নাকামোতো নামক এক ব্যক্তি এই বিটকয়েন আবিষ্কার করেন। এরপর এর বিটকয়েন লেনদেনের জন্য এই সাতোশি নাকামোতো সর্বপ্রথম এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। এরপর থেকেই এই ব্লকচেইন টেকনোলজির জনপ্রিয়তা দিনদিন শুধু বাড়তেই থাকে।
বিটকয়েন লেনদেনের সকল ট্রানজেকশন হিস্টরি (transaction history) ব্লকচেইনর মধ্যে সংরক্ষিত থাকে। মূলত বিটকয়েন আবিষ্কার হবার পর থেকেই এই ব্লকচেইন প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয়।
ব্লকচেইন প্রযুক্তি কিভাবে কাজ করেঃ
আমরা উপরোক্ত তথ্য থেকে জানলাম ব্লকচেইনের প্রত্যেকটি ব্লকে থাকে সেই ব্লকের ডেটা (Data) এবং সেই ব্লকের নিজস্ব হ্যাস ( hash) এবং তার আগের ব্লকের হ্যাস (Hash) । আর হ্যাস (Hash) হল আইডেন্টিটি নাম্বার (identity number) বা পরিচয়। এই hash এর মাধ্যমেই প্রতিটি ব্লক একটির সঙ্গে অন্যটির সঙ্গে চেইন আকারে সংযুক্ত থাকে।
এজন্য প্রতিটি ব্লকের হ্যাস একই রকমের থাকে না বরং ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। প্রতিটি ব্লকের স্টোর ডাটা অনুযায়ী এর hash তৈরি হয়ে থাকে। সুতরাং কোন ব্লকের ডাটা যদি পরিবর্তন করা হয় তবে অটোমেটিক সেই ব্লকের হ্যাস একাই পরিবর্তন হয়ে যাবে।
ধরুন, আপনি কোন ব্যক্তিকে ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে কোন তথ্য বা ডাটা পাঠাবেন। সহজভাবে বলতে গেলে আপনি কাউকে বিটকয়েন পাঠাবেন যে ব্যক্তিকে আপনি বিটকয়েন পাঠাবেন সেই ট্রানজেকশনটি একটি ব্লকের মধ্যে নেওয়া হবে। আর আমরা প্রথমেই জানলাম প্রতিটি ব্লক একটি অপরটির সঙ্গে চেইন আকারে সংযুক্ত থাকে। মূলত এভাবেই এ প্রযুক্তি কাজ করে থাকে।
ব্লকচেইন প্রযুক্তির বিস্তারিত কার্যকারিতা-
ধরুন আপনার কাছে ২০০ টাকা আছে এবং আপনি আমাকে ঐ টাকা থেকে ১০০ টাকা পাঠাবেন। আর এই লেনদেনটি আপনি করতে চাচ্ছেন ব্লকচেইন টেকনোলজির x wallet এ। তারপর আপনি আপনার x wallet থেকে আমার x wallet এ ১০০ টাকা পাঠালেন। আর এখান থেকেই blockchain technology র কাজ শুরু।
আপনি আমাকে টাকা পাঠানোর সাথে সাথেই আপনার এবং আমার এই লেনদেনটির সমস্ত হিসাব বিবরণী নিয়ে ব্লকচেইনের নতুন একটি ব্লক তৈরি হয়ে যাবে। আর এই ব্লকের মধ্যে আপনি থাকবেন sender হিসেবে এবং আমি থাকবো receiver হিসেবে। আর এই টাকার সংখ্যাটিও সেখানে স্পষ্ট লেখা থাকবে। এরপর এই ব্লকটি verify হবার জন্য ব্লকচেইনে যুক্ত থাকা সকল কম্পিউটারে সবার সামনে আসবে।
তারপর সবাই যখন সেই ব্লকটি দেখে সেই ব্লকটির ভেরিফিকেশন তথ্য সঠিক বলে কনফার্ম করবে। তখন এই লেনদেনের সকল statement ব্লকচেইনে সংরক্ষণ করা হবে এবং এর লেনদেনটিও সম্পূর্ণ হবে। এক্ষেত্রে এই block verification এর কাজটি যারা করে থাকেন, তাদেরকে লেনদেনটি সম্পূর্ণ করার জন্য সামান্য কিছু ফি (fee) প্রদান করতে হয়। আশা করি উপরোক্ত তথ্য থেকে আপনি এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন এ প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে।
ব্লকচেইন প্রযুক্তির সুবিধাঃ
আসুন এবার জেনে নেই এই ব্লকচেইন প্রযুক্তির আসল সুবিধা গুলো কি কি?
- এই প্রযুক্তি খুব বেশি নিরাপদ। কারণ এর ডাটা পরিবর্তন বা একে হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব।
- ব্যাংকিং এবং ফিন্যান্স এর সকল লেনদেন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে করলে হ্যাকিং থেকে বাঁচা সম্ভব। বর্তমানে এই সেক্টরে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
- ডাটা বা তথ্য সংগ্রহ বা জমা রাখার সবচেয়ে উন্মুক্ত ও নিরাপদ পদ্ধতি হচ্ছে ব্লকচেইন। আমরা সকলেই জানি ব্লকচেইনের প্রতিটি ব্লকে ডাটা নিরাপদভাবে স্টোর করে রাখা যায়।
- বিশ্বের বহু দেশে নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দল ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করলে ভোট কারচুপি থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
- ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে অনেক উন্নতি করা সম্ভবপর হতে পারে। আপনার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সকল তথ্য যদি ব্লকচেইনের ব্লকে স্টোর করে রাখা হয়।
যেমন ধরুন আপনি কতবার ডাক্তার দেখিয়েছেন, আপনার কি কি সমস্যা কিংবা এর আগে কখনো সমস্যা ছিল কিনা। তাহলে ডাক্তার এসব বিষয়গুলো দেখে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
ব্লকচেইন টেকনোলজির জনপ্রিয়তাঃ-
ব্লকচেইন প্রযুক্তির জনপ্রিয়তা দিনদিন বাড়ার প্রধান কারণ হলো এই প্রযুক্তির উন্নতমানের সিকিউরিটি। আপনারা হয়ত উপরের তথ্য থেকে এটা জেনে গিয়েছেন যে এর ভেতরে থাকা ব্লকের ডাটা পরিবর্তন কিংবা হ্যাক করা অসম্ভব। এই জন্য দিনদিন ক্রমশই এর জনপ্রিয়তা বেড়েই যাচ্ছে।
এছাড়াও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ছাড়া যে কোন লেনদেন বা ট্রানজেকশন নিরাপদে করা যাচ্ছে। এতে মানুষ অনেক সুবিধা পাচ্ছে। এসব কারণের জন্য দিনদিন ব্লকচেইন প্রযুক্তির পপুলারিটি ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে।
বিটকয়েন এবং ব্লকচেইনের মধ্যে পার্থক্য কি?
ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং বিটকয়েন এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। মূলত, ব্লকচেইন হচ্ছে একটি প্রযুক্তি (technology), একটি প্ল্যাটফর্ম (platform) যেখানে শুধুমাত্র বিটকয়েন কিংবা ডিজিটাল মুদ্রা নয়, যেকোনো ধরনের জিনিস ডিজিটালাইজ (Digitalize) করা যায় এবং তার সম্পূর্ণ রেকর্ড রেখে দেয়া যায়।
অর্থাৎ আমরা বলতে পারি ব্লকচেইন হচ্ছে একটি ডিজিটাল খাতা। অপরদিকে, বিটকয়েন হচ্ছে একটি ডিজিটাল মাধ্যম, যার মাধ্যমে যে কোন জিনিস ক্রয় ও বিক্রয় করা যায়। যদিও বিটকয়েনকে মুদ্রা বলা ভুল, এর কারণ বাস্তবে এই মুদ্রার কোন অস্তিত্ব নেই। আর সকল ক্রিপ্টোকারেন্সি (crypto-currency) নেটওয়ার্কগুলিও ব্লকচেইন টেকনোলজি দ্বারা পরিচালিত হয়।
শেষ কথা -ঃ
সর্বশেষে আমরা আশা করতে পারি যে ব্লকচেইন টেকনোলজি মধ্যস্থতাকারীদের (middleman) সরিয়ে সকল প্রকার লেনদেনের দক্ষতা দিনদিন উন্নত করবে। এছাড়া এই পদ্ধতি সমস্ত প্রকার লেনদেনের খরচও অনেকাংশে কমাবে। সেইসাথে এপদ্ধতি স্বচ্ছতাও বাড়াবে এবং সকল প্রতারণামূলক লেনদেন থেকে সাধারণ জনগণ অনেকাংশে মুক্তি পাবে। কারণ এপদ্ধতিতে প্রতিটি সফল লেনদেনের রেকর্ড রাখা হবে।
আজকের এই নিবন্ধটি আপনার কাছে ভালো লাগলে শেয়ার করুন। আর এই নিবন্ধ সম্পর্কে কোন প্রশ্ন বা মতামত থাকলে কমেন্ট সেকশনে জানান। আর নিয়মিত নতুন কিছু জানতে এই ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।সম্পূর্ণ নিবন্ধটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।



আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এইরকম একটি কঠিক টপিক কে সহজভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।
আপনাকেও আন্তরিক ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্যের জন্য। বিষয়টি সহজভাবে উপস্থাপন করতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছে। আপনার উৎসাহ ও সমর্থন আমাদের আরও ভালো কনটেন্ট তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করে।