প্রিয় পাঠক আপনাকে যদি বলা হয় যে, আপনি যে পথে হাঁটছেন, সেই পথের নিচে আরও অনেক পথ রয়েছে, তাহলে নিশ্চয়ই অবাক হবেন! আমরা ইন্টারনেটে যেটুকু ওয়েব ব্যবহার করি, সেটা শুধু ইন্টারনেটের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ইন্টারনেটের যে স্থানে আমরা যাতায়াত করি, সেটি রাস্তার সারফেসের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কিন্তু রাস্তার নিচে আরও অনেক পথ লুকিয়ে আছে, যেগুলোর বিষয়ে আমাদের বেশিরভাগ লোকের জানা নেই। আজ আমি এই ওয়েবের অজানা অংশ নিয়েই আলোচনা করতে যাচ্ছি।

ডিপ ওয়েব কি?
ওয়েবের আকার অসীম। কিন্তু কতটা বিশাল, সেটা কেউ জানে না। তবে বলা যায়, আপনার ধারণা থেকে ওয়েব অনেক অনেক বিস্তৃত, হয়তো হাজার হাজার গুণ। ধরুন, আপনি ওয়েব থেকে কিছু তথ্য বের করতে চান। সাধারণভাবে, আপনি গুগলে বা অন্য কোন সার্চ ইঞ্জিনে সার্চ করবেন। কিন্তু কখনও কখনও আপনি যখন একটি কি-ওয়ার্ড লিখে গুগলে অনুসন্ধান করেন, তখন আপনার পছন্দসই তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না।
এভাবে আপনি ভাবতে পারেন যে, এরকম কোনো তথ্য ওয়েবের মধ্যে নেই। কিন্তু সব সময় এমন ধারণা করা সঠিক নয়। কারণ, Google, Bing অথবা Yahoo তে জানা যায় যে, পুরো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের মাত্র ১% তথ্যই তাদের কাছে আছে! তাই আপনি যদি গুগলে কিছু সার্চ করে অতি প্রয়োজনীয় কিছু না পান, তাহলে তার অর্থ এই নয় যে, ওয়েবে সেটার অস্তিত্ব নেই।
অনেক সময় এমন হতে পারে যে, আপনি যা খুঁজছেন সেটি সার্চ ইঞ্জিন প্রদর্শন করতে পারেনি। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব এমনভাবে ভাবা যেতে পারে যেন এটি পানির উপর ভেসে থাকা একটি বরফখণ্ড, যার সামান্য অংশ আপনি দেখতে পান, কিন্তু অধিকাংশ অংশ পানির নীচে লুকানো রয়েছে।
যেহেতু এটি পানির নীচে রয়েছে, তাই এটি আপনার দৃষ্টির বাইরে। সেই অংশটি দেখার জন্য গভীরতায় যেতে হবে। ওয়েবের ক্ষেত্রেও তাই—আমরা প্রচলিত সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে মাত্র উপরের অংশটি দেখতে পাচ্ছি। অধিকাংশ অংশ এখনো তাদের থেকে দূরে। ওয়েবের এই গোপন অংশটিই হলো ডিপ ওয়েব বা অদৃশ্য ওয়েব।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: সারফেস ওয়েব ও ডিপ ওয়েব। সাধারনভাবে, Google, Bing বা Yahoo এর মতো সার্চ ইঞ্জিনগুলো যেসব তথ্য ইনডেক্স করতে পারে, তা সারফেস ওয়েবের অন্তর্ভুক্ত। আর বিপরীতটি হলো ডিপ ওয়েব।
অর্থাৎ, সার্চ ইঞ্জিন যে অংশ খুঁজে বের করতে পারে না বা ইনডেক্স করতে পারে না, তা ডিপ ওয়েব বা অদৃশ্য ওয়েবের অন্তর্ভুক্ত। এতে বোঝা যায়, সার্চ ইঞ্জিনগুলোর কার্যক্রমের উপর নির্ভর করে ওয়েবের কোন অংশ ডিপ ওয়েবে পড়ে। এরা যদি ইনডেক্স করতে পারে, তবে সেটা সারফেস ওয়েব হিসেবে ধরা হয়, যার ফলে আমরা ওই অংশটি সহজেই খুঁজে পাই।
তাহলে কেন ওয়েবের বিশাল এই অংশের উপর সার্চ ইঞ্জিনের প্রবেশাধিকার নেই? এর পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে। কিন্তু এগুলো বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, সার্চ ইঞ্জিন কীভাবে তথ্য খুঁজে বের করে। সার্চ ইঞ্জিনের কার্যপ্রণালী নিয়ে এই বিষয়ের উপর একটু নজর দিতে পারেন। তবে পাঠকদের সুবিধার জন্য এখানে একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়ার চেষ্টা করছি।
সার্চ ইঞ্জিন সাধারণভাবে ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিয়ে একটি ইনডেক্স তৈরি করে। এই তথ্য আহরণের জন্য বিশেষ ধরনের সফটওয়্যার রোবট ব্যবহার করা হয়। এই রোবটগুলো ‘স্পাইডার’ হিসেবে পরিচিত। প্রথমে, এই স্পাইডারগুলো জনপ্রিয় পেজগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করে।
Also Read
এরপরে, তারা সেই ওয়েবসাইটের অন্যান্য হাইপারলিংকগুলো অনুসরণ করে। এরপর, তারা পেজগুলোর মধ্যে তথ্য একত্রিত করে এবং সেখানে থাকা হাইপারলিংকগুলোও অনুসরণ করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইনডেক্স তৈরি হয়। এই ইনডেক্স ওয়েবের একটি মানচিত্র হিসেবে কাজ করে।
যেমনিভাবে একটি দেশের বা স্থানের মানচিত্র থেকে আপনি সহজে একটি জায়গার অবস্থান বের করতে পারেন, তেমনভাবে এই ইনডেক্স আপনার সার্চের জন্য তথ্য খুঁজে দেয়। যদি মানচিত্র সঠিক হয়, তাহলে আপনি একটি এলাকা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পান; একইভাবে, একটি সার্চ ইঞ্জিনের ইনডেক্স যত ভালো হবে, তত সঠিক ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাপ্তির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
যখন আপনি গুগল এ কিছু অনুসন্ধান করেন, তখন সেটা মনে রেখেছেন যে, আপনি পুরো ওয়েবে নয়, বরং শুধুমাত্র গুগলের ইনডেক্সে সার্চ করছেন। তাই, যদি সেই ইনডেক্সে তথ্য থাকে, তাহলে গুগল সঠিক তথ্য দিতে পারে, নাহলে পারে না।

ডিপ ওয়েব সার্চ ইঞ্জিনগুলোর জন্য কিভাবে অদৃশ্য থাকে?
নিঃসন্দেহে গুগলে যেমন সার্চ ইঞ্জিনগুলো খুব কার্যকর ও শক্তিশালী, তবে কিছু বিষয় তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, যেমন হাইপারলিংক ছাড়া থাকা তথ্য। কোনো সাইট ডিপ ওয়েবে থাকতে পারে তার কিছু কারণ থাকতে পারে, হতে পারে ঐচ্ছিক বা অনৈচ্ছিক। উদাহরণ হিসেবে, এমন একটি ব্লগের পোস্ট যা লেখা হয়েছে কিন্তু প্রকাশিত হয়নি, সেটি ডিপ ওয়েবের অংশ হয়ে যায়।
আসুন এখন ডিপ ওয়েব কনটেন্টের কিছু উদাহরণ দেখি।
- ডাটাবেসের ফলাফল।
- এমন তথ্য, যা একটি সার্চ ইন্টারফেসের মাধ্যমে অ্যাক্সেস করতে হয়।
- যেমন তথ্য, যা কেবলমাত্র সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে পাওয়া যায় এবং পাসওয়ার্ড দ্বারা সুরক্ষিত।
- যেসব পেজের অন্য কোনো ওয়েবসাইটে হাইপারলিংক নেই।
- যেসব কনটেন্ট প্রযুক্তিগতভাবে সীমাবদ্ধ, যেমন CAPTCHA।
- যেসব টেক্সট কনটেন্ট প্রচলিত http:// অথবা https:// প্রোটোকলের বাইরে রয়েছে।

কোনো কনটেন্ট অদৃশ্য হওয়ার কারণ
একটি ওয়েবসাইট কেন সার্চ ইঞ্জিনের কাছে পৌঁছায় না, তার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে এখানে আমরা কিছু প্রধান কারণ বিশ্লেষণ করব।
হাইপারলিংকবিহীন পেজ- যদি কোনো ওয়েব পেজের URL অন্য কোনো পেজে হাইপারলিংক না করা থাকে, তবে সার্চ ইঞ্জিন সেই পেজ তল্লাশিতে সক্ষম হয় না। এই কারণে, সার্চ ইঞ্জিনের জন্য ওই ওয়েবসাইটটি একটি দ্বীপে পরিবর্তিত হয়।
রিয়েল টাইম তথ্য- দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্য যা মূহুর্তের মধ্যে বদলে যেতে পারে, যেমন শেয়ার বাজারের মূল্যের ওঠানামা।
বিশেষত ছবি বা ভিডিও নির্ভর ওয়েবপেজ- যদি কোনো ওয়েবপেজে পর্যাপ্ত টেক্সট না থাকে, তাহলে সার্চ ইঞ্জিন সেই পেজের বিষয়বস্তু বুঝতে পারবে না এবং ফলে সেই পেজ উপেক্ষিত হবে।

যদি একটি সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে করা অনুসন্ধানের সঠিক তথ্য পাওয়া না যায়, তাহলে এর অর্থ এই নয় যে, ইন্টারনেটের ওপর ওই বিষয়ের কিছুই নেই! কোনো পৃষ্ঠা যদি পাওয়া না যায়, তাও মানে এই নয় যে, তা প্রবেশের অযোগ্য; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটাই সম্ভব নয়।
এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আজ যে বিষয়বস্তু ডিপ ওয়েবে লুকিয়ে রয়েছে, আগামীকাল সেটিকে কোনো সার্চ ইঞ্জিন পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে পারে এবং আপনার সহজলভ্যতায় আনতে পারে! আর এই ডিপ ওয়েবের মধ্যে আমরা প্রতি দিনই প্রবেশ করছি।
শেষ কথা
যা হোক, এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া যাক। আমরা যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি তা হলো ডিপ ওয়েব; এটি কিন্তু ডার্ক ওয়েব নয়! অনেকেই এই দুটির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে ভুল করেন এবং একে অপরের সাথে মিলিয়ে ফেলেন।
যদি ডিপ ওয়েবকে ইন্টারনেটের লুকানো জগৎ হিসেবে ভাবেন, তাহলে বলা যেতে পারে যে ডার্ক ওয়েব হচ্ছে ইন্টারনেটের অন্ধকার দিক। ডার্ক ওয়েব আসলে ডিপ ওয়েবের একটি অংশ, তবে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বিদ্যমান! ডার্ক ওয়েব সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ডার্ক ওয়েব, ইন্টারনেট দুনিয়ায় অপরিচিত জগৎ। এই পোস্টটি পড়ে আসতে পারেন।


