আমরা সকলেই অবগত, প্রযুক্তির বর্তমান সময়ের ফ্রিল্যান্সিংএর কাজের চাহিদা আকাশ ছোঁয়া। এখন নিজের বাড়িতে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনলাইনে উপার্জন করা সম্ভব। ওয়েব ডিজাইন ও গ্রাফিক্স ডিজাইন এর মধ্যে রয়েছে অনেক পার্থক্য।
ফ্রিল্যান্সিং এর দুনিয়ায় প্রতিবছর কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশে অসংখ্য যুবক-যুবতী কম্পিউটার ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে এগিয়ে আসছে। এটি অবশ্য সময়ের উপযোগী বিষয়। আপনি যদি জানেন, বাংলাদেশি যেসব সফল ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, তাদের বেশিরভাগ ওয়েব ডিজাইন ও গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে কাজ করেন। এছাড়া, একটি বড় অংশ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রেও সক্রিয়।
নতুন পরিস্থিতিতে আপনি কি ওয়েব ডিজাইন শেখা শুরু করবেন না কি গ্রাফিক্স ডিজাইন, এবং কোন ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ রয়েছে, তা বের না করতে পারলে, এই পোস্ট টি আপনার জন্য লেখা। চাহিদার নিরিখে ফ্রিল্যান্সিং কাজের জন্য ওয়েব ডিজাইন ও গ্রাফিক ডিজাইন বেশ উচ্চ চাহিদার দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত। এই দুটি ক্ষেত্রই ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসের মূল ক্যাটাগরি।
আপনি যদি Fiverr, UpWork, Freelancer দিকে নজর দেন, তাহলে দেখতে পাবেন ওই মার্কেটপ্লেসের মূল ক্যাটাগরিগুলো ওয়েব ডিজাইন এবং গ্রাফিক ডিজাইন। তবে, আপনার জন্য কোনটি শেখা শুভ হবে, ওয়েব ডিজাইন না গ্রাফিক ডিজাইন? এই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কয়েকটি বিষয়ের উপর গভীরভাবে ভেবে পরবর্তী সিদ্ধান্তে আসা উচিত।

আমি নিচে ওয়েব ডিজাইন এবং গ্রাফিক ডিজাইনের সুবিধা ও মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরেছি। এতে আপনার জন্য দক্ষতার নির্বাচন করা সহজ হবে।
ওয়েব ডিজাইন (Web Design)
ওয়েব ডিজাইন এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্ট দুটি ভিন্ন বিষয়। আপনি যদি দুটি বিষয়কে অনুশীলন করে একটি সম্পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করতে চান, তাহলে কিছু কোডিং ভাষা শেখার প্রয়োজন। যেমন- HTML, CSS, JavaScript, jQuery প্রভৃতি।
এই ভাষাগুলো শিখলে আপনি যেকোনো ধরনের ওয়েবসাইট ডিজাইন করতে সক্ষম হবেন। তবে এসব ভাষা ব্যবহার করে তৈরি করা ওয়েবসাইটগুলো স্ট্যাটিক ওয়েবসাইট বলে পরিচিত। স্ট্যাটিক ওয়েবসাইটকে আরো উন্নত ও ব্যবহারবান্ধব করতে কিছু অতিরিক্ত ভাষার প্রয়োজন হতে পারে, যেমন- PHP, AHP ইত্যাদি।
বর্তমানে ৯৫ শতাংশ ওয়েবসাইট বিভিন্ন CMS সফটওয়্যার ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে – WordPress, Wix, Joomla, Shopify, Drupal, Magento এবং অন্যান্য।
আপনি যদি ওয়েবসাইট ডিজাইন করতে চান, তবে যেকোনো CMS সফটওয়্যার পছন্দ করে কাজ করতে পারেন। এতে আপনার কাজের উন্নতি সহজ হবে।
Also Read
CMS সফটওয়্যারের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে WordPress। বিশ্বের ৪৭. ৭ মিলিয়ন ওয়েবসাইট WordPress CMS ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছে। এটি PHP ভাষায় তৈরি।
এছাড়া, বেশিরভাগ CMS সফটওয়্যারই PHP ভাষায় নির্মিত। আপনি যদি HTML, CSS, JavaScript, jQuery শেখার পাশাপাশি PHP শিখে নিতে পারেন, তবে সব ধরনের CMS সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করতে পারবেন। আমি WordPress নিয়ে কাজ করছি। আপনিও WordPress কে লক্ষ্য করুন। কারণ, WordPress সবচেয়ে জনপ্রিয় CMS, কাজের সুযোগও অনেক এবং শেখার ক্ষেত্রে সুবিধাও বেশি।
অনেকে মনে করেন, কিছু রেডিমেড থিম কাস্টমাইজ করা শিখলেই WordPress শেখা সারা। এটি একটি ভুল তথ্য। এটি কেবল WordPress এর মৌলিক জ্ঞান।কিন্তু বাস্তবে ওয়েব ডিজাইন মূলত থিমের কাস্টমাইজেশনের কাজ বোঝায়। তবে শুধু এই দক্ষতা অর্জন করলেই টিকে থাকা সম্ভব নয়।
ক্লায়েন্টরা প্রায়ই রেডিমেড থিমে বিভিন্ন কোড পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ফাংশন যুক্ত করার অনুরোধ করেন। এজন্য আপনাকে ওয়েব ডিজাইন শিখার পাশাপাশি ওয়েব ডেভেলপমেন্টও জানতে হবে।
সুতরাং, যেকোনো ওয়েব ডিজাইন তৈরির জন্য HTML, CSS, JavaScript, jQuery ইত্যাদির সাথে PHP ভাষা শেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রাফিক্স ডিজাইন
গ্রাফিক্স ডিজাইন একটি ব্যাপক এবং সমৃদ্ধ ক্ষেত্র। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শিল্প নির্মাণ। একজন শিল্পী কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে ধারণা, কল্পনা, তথ্য এবং ক্লায়েন্টের চিন্তা সমন্বয় করে দৃশ্যত প্রকাশিত ছবি বা ভিডিও তৈরি করেন।

সার্বিকভাবে, ছবি দিয়ে নকশা নির্মাণকে গ্রাফিক্স ডিজাইন বলা হয়। গ্রাফিক্সের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শ্রেণীকরণ রয়েছে। যেমন- স্টিল ছবি গ্রাফিক, চলমান গ্রাফিক / ভিডিও গ্রাফিক ইত্যাদি।
তবে, সাধারনত আমরা স্টিল ছবি গ্রাফিকের কাজকেই গ্রাফিক্স ডিজাইন হিসেবে জানি। গ্রাফিক্স ডিজাইন এমন একটি বিষয় যাতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজের সাথে জড়িয়ে রয়েছে। পোস্টার ডিজাইন, ব্যানার ডিজাইন, প্যাকেট ডিজাইন, লোগো ডিজাইন, ভিডিও সম্পাদনা, সফটওয়্যার ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন ইত্যাদি ক্ষেত্রে গ্রাফিক্স ডিজাইন অপরিহার্য।
ফ্রিল্যান্সিং ভিত্তিক ক্যারিয়ারগুলোর মধ্যে গ্রাফিক্স ডিজাইন কর্মক্ষেত্রটি বেশ জনপ্রিয়। গ্রাফিক্স ডিজাইন বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছেন, অ্যাডোবি ফটোশপ, অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর, অ্যাডোবি ইন ডিজাইন, ক্যানভা, কোরেলড্র ইত্যাদি।
আপনি যে কোনো গ্রাফিক্স কাজের জন্য সফটওয়্যার শিখতে পারেন, তবে আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী অ্যাডোবি ফটোশপ, অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর এবং অ্যাডোবি ইন ডিজাইন শিখার পক্ষপাতী। অ্যাডোবির পণ্যগুলো উন্নত এবং জনপ্রিয়। শিখতে অনেক সুবিধা রয়েছে এবং কাজের সুযোগও বেশি। তাছাড়া, গ্রাফিক্স ডিজাইনের অনেক উন্নত কাজও এই সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার করে করা সম্ভব।
কোনটা সহজ এবং কোনটা কঠিন?
স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, ওয়েব ডিজাইন নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইন কোনটি বেশি চ্যালেঞ্জিং? এটির উত্তর হল, ওয়েব ডিজাইন গ্রাফিক্স ডিজাইনের চাইতে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
সম্পূর্ণ ওয়েব ডিজাইন শেখার জন্য আপনাকে প্রায় ৬ মাস থেকে ১ বছরেরও বেশি সময় দিতে হবে। অন্যদিকে, গ্রাফিক্স ডিজাইন সম্পন্ন করতে ৩ মাস থেকে ৬ মাসের মধ্যেই কাজটি শেষ করা সম্ভব। তবে সময়ের এই হিসাব সকলের জন্য এক হতে পারে না। যারা পূর্ব অভিজ্ঞতা রাখে বা দ্রুত শেখার ক্ষমতা আছে, তাদের জন্য সময় কম লাগবে। বিপরীতে, যারা সম্পূর্ণ নতুন বা ধীর গতির শিক্ষার্থী, তাদের জন্য সময় বেশি লাগবে।
এছাড়া, ওয়েব ডিজাইন শেখার জন্য অবশ্যই কম্পিউটার কিবোর্ডের টাইপিং দক্ষতা ভাল হতে হবে। গ্রাফিক্স ডিজাইনের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। তবে গ্রাফিক্স ডিজাইনের জন্য সাধারিতভাবে টাইপিং দক্ষতা থাকলেই চলে। কিন্তু ওয়েব ডিজাইনের জন্য মনোযোগী টাইপিং স্কিল প্রয়োজন।
কোন কাজের জন্য বেশি অর্থ?
আমরা সকলেই বুঝতে পারি কোন কাজ থেকে বেশি অর্থ উপার্জন সম্ভব। সাধারণত যে কাজের জন্য বেশি পরিশ্রম করা হয়, সেখানেই টাকা বেশি পাওয়া যায়।
আপনার ধারণা সঠিক, ওয়েব ডিজাইনে আয় গ্রাফিক্স ডিজাইন থেকে বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু সত্য হল, গ্রাফিক্স ডিজাইন তুলনায় ওয়েব ডিজাইন করা অনেক কঠিন ও শ্রমসাধ্য। তবে উভয় ক্ষেত্রের দক্ষতা ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ গ্রাফিক্স ডিজাইনের ওপর হয়ে থাকে। তাছাড়া, গ্রাফিক্স ডিজাইন শেখা তুলনামূলক সহজ।
এটি সহজজনিত কারণ হলো, গুণগত শিক্ষার প্রয়োজন নেই। গণিত বা ইংরেজির দক্ষতা খুব ভালো না হলেও চলবে। তবে ওয়েব ডিজাইন শিখতে গেলে গাণিতিক দক্ষতার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার জ্ঞানও প্রয়োজন। তাই সহজভাবে অনলাইনে আয় করার জন্য গ্রাফিক্স ডিজাইন অনেকেই গ্রহণ করে।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ঃ
প্রিয় পাঠক, ওয়েব ডিজাইন বা গ্রাফিক ডিজাইন কোন দক্ষতা আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত তা আপনি নিজেরাই খুঁজে বের করতে পারেন। আমি শুধুমাত্র একটি ধারণা উপস্থাপন করেছি।
তবে সত্যি হচ্ছে, গ্রাফিক ডিজাইন এবং ওয়েব ডিজাইন উভয় ক্ষেত্রেই চমৎকার ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে বহু ফ্রিল্যান্সার এই দক্ষতাগুলো নিয়ে কাজ করছেন। আমি নিজেও এর সাথে যুক্ত। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিংয়ের উন্নতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ভবিষ্যতে দেশে ফ্রিল্যান্সাররা রেমিট্যান্স খাতে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে।
শেষ কথা
পরিশেষে আমি বলব, যদি আপনার কাছে পর্যাপ্ত সময় থাকে তবে ওয়েব ডিজাইন শিখুন। কিন্তু যদি সময় কম হয়, তবে গ্রাফিক ডিজাইন শিখে নিতে পারেন। দুই ক্ষেত্রেই প্রচুর কাজের সুযোগ রয়েছে। প্রতিনিয়ত টেক বিষয়ে চোখ রাখুন এই ওয়েবসাইট।


