আয়কর রিটার্ন দাখিল করার সময়ঃ
আসুন সবার আগে জানি আয়কর রিটার্ন দাখিল করার সময় সম্পর্কে। সাধারণত টিন (TIN) সার্টিফিকেট গ্রহণ করার পর থেকে প্রত্যেক বছর আপনাকে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
প্রতি বছরই নভেম্বর মাসে আয়কর রিটার্ন হিসাব গ্রহণ শুরু হয়। এজন্য প্রতিটি নাগরিকদের টিন সার্টিফিকেট গ্রহণ করার পর প্রতি বছরই নভেম্বর মাসে ইনকাম ট্যাক্স দাখিল করতে হয়।

যদি আপনার আয়কর এপ্লিকেবল লিমিট না থাকে তবু্ও আয়কর রিটার্ন দাখিল নির্দিষ্ট সময়েই করতে হবে।
যেসব সুবিধা পেতে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণ দিতে হয়ঃ
- ১। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে।
- ২। গ্যাস এবং পানির মত জরুরি সেবা পেতে।
- ৩। ব্যাংকে আমদানির জন্য LC খুলতে হলে।
- ৪। ব্যাংক বা যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ লক্ষ টাকার বেশি লোন পেতে।
- ৫। ব্যবসা শুরু করতে হলে।
- ৬। ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা উদ্দোক্তা পরিচালক হতে হলে।
- ৭। পৌর বা শহর এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নিতে হলে।
- ৮। ড্রাগ লাইসেন্স থাকলে অথবা নতুন করে নিতে চাইলে।
- ৯। অস্ত্রের লাইসেন্স বানাতে।
- ১০। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বা ইংরেজি ভার্শনের স্কুলে সন্তান ভর্তি কার্যক্রমে।
- ১১। জমি বা বাসা ভাড়া দিতে চাইলে বা কিনতে চাইলে।
- ১২। পরিবহন সেবার ব্যবসা থাকলে বা করতে চাইলে।
- ১৩। সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো ব্যাংকে সেভিংস একাউন্টে টাকা ১০ লক্ষ টাকার বেশি হলে।
এমন আরও কিছু সেবা রয়েছে যেগুলো পেতে হলে আপনাকে আয়কর রিটার্ন জমা করার প্রমাণ দিতে হবে।
আয়কর রিটার্ন দাখিল করার পূর্ব প্রস্তুতিঃ
অনলাইনে ইনকাম ট্যাক্স জমা দেবার সঠিক নিয়ম জানার পরেও অনেকেই নানা ভোগান্তির শিকার হন। এজন্য আয়কর রিটার্ন জমার আগেই পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে কিছু কমন বিষয় অবশ্যই মনে রাখবেন। যেমন-
- চলতি বছরের আয়কর জমার সবগুলো নির্দেশনা খুব ভালভাবে পড়ে নেওয়া।
- পূর্বের বছরের আপনার দাখিলকৃত আয়কর রিটার্ন দাখিল কপি সঙ্গে রাখা।
- আয় বিবরণী, লাভ- লোকসান হিসাব, ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক আয় ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য আগেই গুছিয়ে রাখা।
- আয়কর রিটার্ন দাখিলে অবিজ্ঞ কোন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার নিয়মঃ
আসুন এবার জেনে নেই, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার নিয়ম সম্পর্কে। মাত্র বেশ কয়েকটি ধাপ সঠিকভাবে অনুসরণ করে আপনি ঘরে বসেই ইনকাম ট্যাক্স জমা করতে পারবেন।
ঘরে বসে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়মঃ ধাপ-১
অনলাইনে ইনকাম ট্যাক্স দাখিলের ১ম ধাপ হলো- আপনাকে E-Return Registration ওয়েবসাইটে যেতে হবে। তারপর সেখান হতে মেনু বার থেকে Sign Up বাটনে ক্লিক করে একটি Account তৈরি করতে হবে।
আপনার যদি পূর্বের কোন একাউন্ট না থাকে তবে সেখানে আপনার টিন সার্টিফিকেট নাম্বার, ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর এবং নির্দিষ্ট ক্যাপচা ( Captcha) পূরণ করে একটি নতুন একাউন্ট খুলতে হবে।
আর আপনার যদি আগের কোন একাউন্ট থাকে তবে সেখানে আপনাকে Log In করতে হবে। ড্যাশবোর্ডে লগ ইন করার পর বাম পার্শের মেনু থেকে আপনাকে Return Submission অপশন টিতে ক্লিক করতে হবে।
Also Read
এরপর সেখানে আপনার আয়ের বছর এবং আয়ের উৎস সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রদান করতে হবে।
ঘরে বসে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়মঃ ধাপ-২
আপনার আয়ের বছর এবং আয়ের উৎস সংক্রান্ত তথ্য হিসেবে Return Scheme, Income Year, Assessment Year,Heads of Income এবং Any income other sources সম্পর্কিত তথ্যগুলো দিতে হবে।
এই ধাপের কাজের সুবিধার্থে যেসকল বিষয়গুলো জেনে রাখা প্রয়োজনঃ
- Return Scheme এর এখানে Universal Self লেখাটি ক্লিক করুন।
- এরপর Any income from the following sources অপশন থেকে যদি কোন source দ্বারা আপনার উপার্জন না হয় তাহলে এই অপশনটি স্কিপ (Skip) করুন।
ঘরে বসে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়মঃ ধাপ-৩
এই ধাপে আপনি কোন উৎস থেকে কত টাকা উপার্জন করেন সেসকল তথ্য প্রদান করতে হবে। এই ধাপে সঠিকভাবে কাজ করার সুবিধার্থে আপনার আরও যেসব বিষয়ে জেনে রাখা প্রয়োজনঃ
- আপনি যদি এধরণের কোন বিনিয়োগের দ্বারা আয় করে থাকেন যে-ধরনের আয় থেকে সরকার কর ছাড় দিয়েছে, সেক্ষেত্রে আপনি এখানে Claim Tax rebate for investment ঘরটিতে টিক চিহ্ন দিন।
- আর আপনার আয় যদি বছরে চল্লিশ লক্ষ টাকার বেশি হয় তাহলে T10B Requirement অপশনে গিয়ে আপনার আয় এবং ব্যয়ের হিসাব দেখাতে হবে।
যদি এসকল কোনটিই আপনার না হয় তাহলে এই দুটো অপশনকে স্কিপ করে সামনে এগিয়ে যান।
ঘরে বসে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়মঃ ধাপ-৪
এই ধাপে আপনার মোট আয় থেকে বিভিন্ন ব্যয় বাদ দিতে হবে। এরপর নীট আয় কত সেইসব তথ্য প্রদান করতে হবে। এই ধাপে সঠিকভাবে কাজ করার সুবিধার্থে, আপনার আরও যেসব বিষয়ে জেনে রাখা প্রয়োজনঃ
- আপনার বেতন যদি মাসিক না হয়ে অন্য কোন সোর্স থেকে হয় তাহলে ড্রপ ডাউনের দ্বারা সেই অপশনটি নির্বাচন করুন।
ঘরে বসে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়মঃ ধাপ-৫
এই ধাপে আপনার সকল প্রকার ব্যয়ের তথ্য প্রদান করতে হবে। যেমনঃ বাৎসরিক পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত ব্যয়সমূহ ইত্যাদি।
তবে আপনি যদি T10B Requirement অপশনটা পূর্বেই পূরণ করে থাকেন। তাহলে এটি পূরণ করা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক।
সহজভাবে বলতে গেলে, আপনার আয় যদি বছরে চল্লিশ লক্ষ টাকার বেশি হয়, তাহলে এটি পূরণ করতে হবে। অন্যথায় আপনি এই অপশনটি স্কিপ (Skip) করতে পারেন।
এরপর আয়কর পরিশোধ করার ফরমটি আপনি স্কিনের সামনে দেখতে পাবেন।
ঘরে বসে আয়কর রিটার্ণ দাখিলের নিয়মঃ ধাপ-৬
এই ধাপে আপনাকে প্রদানকৃত করের পরিমাণ দেখাবে। অনলাইনে আয়কর জমার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ইতিপূর্বে আপনি যদি উৎস কর বা অগ্রিম কর প্রদান করে থাকেন।
তাহলে সেটি অটোমেটিক বিয়োগ হয়ে যাবে। আর আপনাকে ঠিক কত পরিমাণ কর প্রদান করতে হবে তা দেখাবে। আর আপনার যদি কোনপ্রকার কর না দিতে হয়, তাহলে এমাউন্টও শূন্য দেখাবে। যাকে বলা হয় জিরো রিটার্ন।
এরপর আপনার জন্য নির্ধারিত আয়কর প্রদানের জন্য পেমেন্ট অপশন আসবে। এরপর হলুদ কালার বাটনে অফলাইনে এবং নীল কালার বাটনে অনলাইনে পেমেন্ট করার অপশন পেয়ে যাবেন।
আয়কর রিটার্ন টাকা পেমেন্ট করার নিয়মঃ
আপনাদের সুবিধার্থে অনলাইন এবং অফলাইনে কিভাবে পেমেন্ট করবেন এই দুটো পেমেন্ট পক্রিয়াই সহজ ভাবে নিচে আলোচনা করব।
অফলাইন রিটার্ন পেমেন্টঃ
অফলাইন পেমেন্টে আপনার কোন প্রকার ফি প্রদান করতে হবে না। এখন স্ক্রিনের বাম পার্শ্বে হলুদ রঙের বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এরপর আপনার আয়কর রিটার্ন ফরমটি প্রিন্ট (Print) করে আপনার পার্শ্ববর্তী আয়কর অফিসে জমা দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আপনার আয়কর রিটার্ন দাখিল পরিশোধ হবে।
অনলাইন রিটার্ন পেমেন্টঃ
অনলাইন পেমেন্টে আপনাকে কষ্ট করে আয়কর অফিসে গিয়ে জমা হতে হবে না। এখন স্ক্রিনের ডান পার্শ্বের নীল রঙের বাটনে ক্লিক করে অনলাইনে রিটার্ন প্রসেস দাখিল করতে হবে।
নীল রঙের বাটনে ক্লিক করার পর আপনাকে একটি প্রিভিউ (Preview) দেখানো হবে আপনার অনলাইন রিটার্ন তথ্যগুলোর। প্রিভিউ দেখা হয়ে গেলে ভেরিফিকেশন বাটনে টিক চিহ্ন দিয়ে সাবমিট করতে হবে।
এরপর একটি পপ-আপ অপশন আসবে। পপ-আপ অপশনে একটি সতর্কতা দেখানো হবে যেখানে উল্লেখ থাকবে আপনি কি রিটার্নটি সাবমিট করতে চাচ্ছেন কি না।
এখন আপনি পেমেন্ট করতে চাইলে ইয়েস বাটনে ক্লিক করতে হবে। মনে রাখবেন – Yes বাটনে ক্লিক করার পর সেটি আর কোনভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না।
তাই আপনার প্রদানকৃত সকল তথ্য পুনরায় দেখে নিশ্চিত হয়ে ইয়েস বাটনে ক্লিক করবেন।
এগুলো পড়তে পারেন –
ঘরে বসে আয়কর রিটার্ণ দাখিলের নিয়মঃ ধাপ-৭
আয়কর রিটার্ন পেমেন্ট সফল হলে আপনাকে একটি বার্তা দেখানো হবে যেখানে আপনার আয়কর রিটার্ন সাবমিশনের ID নাম্বার দেয়া থাকবে এবং একটি রশিদ ( Receipt) দেয়া হবে।
যেটি আপনি চাইলে প্রিন্ট করে বা ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করতে পারেন।উপরোক্ত নিয়ম অনুসারে প্রতিটি ধাপ ফলো করার মাধ্যমে খুব সহজেই আপনি অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন যাচাইঃ
আপনি অনলাইনে অনলাইনে ইনকাম ট্যাক্স জমা করার পর যদি সেটি অনলাইনে যাচাই করতে চান তাহলে সেটিও খুব সহজেই করতে পারবেন। এক্ষেত্রে আপনাকে নিম্নের সামান্য কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।
ধাপ ১ঃ
প্রথমে আপনাকে www.verification.taxofficemanagement.gov.bd এই ওয়েব সাইটে যেতে হবে।
ধাপ ২ঃ
দ্বিতীয় ধাপে করবর্ষ সিলেক্ট করতে হবে।
ধাপ ৩ঃ
তৃতীয় ধাপে স্ক্রিনে দেখানো টিন নম্বর বক্সটিতে আপনার TIN নম্বর লিখুন।
ধাপ ৪ঃ
সবশেষে ক্যাপচা (Captcha) কোডটি নিচের বক্সে লিখে Verify বাটনে ক্লিক করলে আপনার আয়কর রিটার্ন যাচাই করতে পারবেন।
শেষ কথাঃ
এপর্যন্তই ছিলো আজকের আলোচনা। আমি এই আর্টিকেলে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম সংক্রান্ত সকল বিষয় বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি।
আশা করি আপনারা আজকের পোস্ট থেকে উপকৃত হয়ে অতি সহজেই অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
এই পোস্ট টি সম্পর্কে আপনার যদি কোন প্রশ্ন বা মতামত থাকে তাহলে নিচে কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জানাবেন। পোস্টটি ভাল লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন।


